এক নজরে ছাত্রশিবির সিলেট মহানগর কর্তৃক আয়োজিত এসএসসি, দাখিল ও সমমান পরীক্ষায় জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠান।
#Sylhet#Shibir#shibirsylhetcity#Bangladesh
সম্পূর্ণ ভিডিও : https://t.co/CHjT2MwvM6
যখন রমজান মাসের আগমন ঘটে, তখন জান্নাতের দরজাসমূহ খুলে দেওয়া হয় এবং জাহান্নামের দরজাসমূহ বন্ধ করে দেওয়া হয়। আর শয়তানদেরকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়। বুখারী : ১৮৯৮; মুসলিম : ১০৭৯
ছাত্রশিবিরের ১৪৭তম শহীদ আলী আজগর খান রাহাত ভাইয়ের শাহাদাত বার্ষিকী উপলক্ষ্যে কবর যিয়ারত করছেন কেন্দ্রীয় অর্থ সম্পাদক তৌহিদুল হক মিসবাহসহ সিলেট মহানগর নেতৃবৃন্দ।
#shibirsylhet#ISupportShibir#Sylhet#Shibir47Yrs
ছাত্রশিবিরের ১৪৭তম শহীদ আলী আজগর খান রাহাতের শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষ্যে সিলেট মহানগর কর্তৃক আয়োজিত আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিলে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন ও দোয়া পরিচালনা করেন সেক্রেটারি জেনারেল জাহিদুল ইসলাম।
#shibirsylhet#Sylhet#Shibir
ছাত্রশিবিরের ৪৭তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উপলক্ষ্যে সিলেট মহানগর কর্তৃক আয়োজিত শিক্ষা সেমিনার’২৪-এ প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখছেন ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি জেনারেল জাহিদুল ইসলাম।
#ISupportShibir#JoinShibir#Shibir47Yrs
সৎ, দক্ষ ও দেশপ্রেমিক নাগরিক গড়তে ছাত্রশিবিরকে সমর্থন করুন।
#KnowShibir#JoinShibir#Shibir47Yrs
শিবির সম্পর্কে জানতে ও সমর্থক হতে ভিজিট করুন : https://t.co/9RBUYA2Psl
⇲ উপমহাদেশে ইসলামের আগমন ও প্রসার ⇱
বাংলায় ইসলামের আগমন ভারতীয় উপমহাদেশে ইসলামের আগমনের ইতিহাসের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বাংলাসহ সমগ্র উপমহাদেশে ইসলামের আগমন হয়েছিল নানাবিধ প্রক্রিয়ায়। এক্ষেত্রে প্রধানত চারটি প্রক্রিয়ার কথা উল্লেখ করা যেতে পারে-
১. আরব ব্যবসায়ীদের দ্বারা ইসলাম প্রচার
২. দাঈগণ কর্তৃক দাওয়াতি কাজ
৩. খোলাফায়ে রাশেদাগণ কর্তৃক বিশেষ অভিযান
৪. রাজনৈতিক বিজয়
ইতোপূর্বে আমরা আরব ব্যবসায়ীদের দ্বারা ইসলাম প্রচার এর বিষয়টি আলোচনা করেছি।
এই পর্বে আমাদের আলোচ্য বিষয় :
| দাঈগণ কর্তৃক দাওয়াতি কাজ এবং খোলাফায়ে রাশেদাগণ কর্তৃক বিশেষ অভিযানের মাধ্যমে উপমহাদেশে ইসলামের প্রসার।
‖ সাহাবীগণ কর্তৃক দাওয়াতি কাজ
নির্ভরযোগ্য ইতিহাস থেকে প্রমাণিত হয় যে, দ্বিতীয় খলিফা হযরত ওমর ফারুক (রা.)-এর খিলাফতকালে বিশ্বনবীর পাঁচজন মহান সাহাবি উপমহাদেশে আগমন করেছিলেন।[1] ২৩-৪০ হিজরির মধ্যেই পাক-ভারতের পশ্চিম উপকূল পর্যন্ত ওই মুসলিম প্রচারক ও মুজাহিদ বাহিনী পৌঁছেছিলেন বলে ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়।[2] এসময় যে পাঁচজন সাহাবির ভারত আগমনের সন্ধান পাওয়া যায় তারা হলেন :
(১) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ইতবান (রা.),
(২) হযরত আসেম ইবনে আমর আততামীমী (রা.),
(৩) হযরত সুহার ইবনে আল-আবদী (রা.),
(৪) হযরত সুহাইল ইবনে আদী (রা.) এবং
(৫) হযরত হাকাম ইবনে আবিল আস আছ ছাকাফী (রা.)।[3]
মুহাদ্দিস ইমাম আবাদান মারওয়াযীর গ্রন্থ থেকে জানা যায় যে, মুহাম্মাদুর রাসূলূল্লাহ (সা.)-এর সাহাবী আবু ওয়াক্কাস মালিক ইবনু ওহাইব (রা.) নবুওয়াতের পঞ্চম সনে (অর্থাৎ খ্রিস্টীয় ৬১৫ সনে) হাবশায় (ইথিয়পিয়ায়) হিজরত করেন। নবুওয়াতের সপ্তম সনে তিনি কায়েস ইবনু হুযাইফা (রা.), উরওয়াহ ইবনু আছাছা (রা.), আবু কায়েস ইবনুল হারিস (রা.) এবং কিছু সংখ্যক হাবশী মুসলিমসহ দুইটি জাহাজে করে চীনের পথে সমুদ্র পাড়ি দেন। ... শায়খ যাইনুদ্দীন তার রচিত গ্রন্থ ‘তুহফাতুল মুজাহিদীনে’ লেখেন যে ভারতের তামিল ভাষার প্রাচীন গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে যে, একদল আরব জাহাজে চড়ে মালাবার এসেছিলেন। তাদের প্রভাবে রাজা চেরুমল ইসলাম গ্রহণ করেন। অতপর মক্কায় গিয়ে তিনি কিছুকাল মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহর (সা.) সান্নিধ্যে থাকেন।[4]
আবু ওয়াক্কাস মালিক ইবনু ওহাইব (রা.) দীর্ঘ নয় বছর সফরে ছিলেন। মালাবার বা চেরর রাজা চেরুমল পেরুমল তাঁর কাছেই ইসলামের দাওয়াত পেয়েছিলেন বলে প্রতীয়মান হয়। চীন যাবার পথে তাঁকে বাংলাদেশের বন্দরগুলোতেও নোঙর করতে হয়েছে। আর তাঁর পবিত্র সাহচর্যে এসে বাংলাদেশের কিছু সংখ্যক মানুষ নিশ্চয়ই ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। তবে কারা ছিলেন সেই সৌভাগ্যবান ব্যক্তি তা আমাদের জানা নেই।... চীনের মুসলিমদের বই পুস্তক থেকে জানা যায় যে আবু ওয়াক্কাস মালিক ইবনু ওহাইব (রা.) তাঁর সাথীদেরকে নিয়ে খ্রিষ্টীয় ৬২৬ সনে চীনে পৌঁছেন।... আবু ওয়াক্কাস মালিক ইবনু ওহাইব (রা.) ক্যান্টন বন্দরে অবস্থান করেন। সমুদ্র তীরের কোয়াংটা মসজিদ তিনিই নির্মাণ করেন। মসজিদের নিকটেই রয়েছে তাঁর কবর। দুইজন সাহাবির কবর রয়েছে চুয়ান-চু বন্দরের নিকটবর্তী লিং পাহাড়ের ওপর। চতুর্থজন দেশের অভ্যন্তর ভাগে চলে যান।[5]
এসব তথ্য প্রমাণ করে যে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহর (সা.) যুগেই চীনে সর্বপ্রথম ইসলাম পৌঁছে এবং তা পৌঁছে একদল খাঁটি আরব মুসলিমের নেতৃত্বে। যারা বাংলাদেশের বন্দরগুলোতে নোঙর করে প্রয়োজনীয় সামগ্রী সংগ্রহ করে চীন অভিমুখে যাত্রা করেছিলেন। তারা বাংলাদেশেও অবশ্যই ইসলাম প্রচার করেছেন। সে অনুসারে খ্রিস্টীয় সপ্তম শতকেই বাংলাদেশে প্রথম ইসলামের আগমন ঘটে।
‘জাতীয় অধ্যাপক’ দেওয়ান মুহাম্মদ আজরফের মতে, হযরত ওমরের (রা.) শাসনামলে মামুন (রা.) ও মুহাইমেন (রা.) নামক সাহাবিদ্বয় বাংলাদেশে আগমন করেন।
‖ সুফী-মাশায়েখগণ কর্তৃক দাওয়াতি কাজ
ইসলামের সোনালী যুগের এবং তার নিকটবর্তী যুগের মুসলমানগণ যেই উদ্দেশ্যে যেখানেই যেতেন না কেন তাঁরা ইসলামী জীবনদর্শনের মর্মকথা মানুষের সামনে উপস্থাপন করার কোন সুযোগ হাতছাড়া করতেন না। ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য যেইসব মুসলিম বাংলাদেশে এসেছিলেন তারাও নিশ্চয়ই মুবাল্লিগ হিসেবে তাঁদের কর্তব্য পালন করেছেন। তবে তাঁদের তৎপরতা ও প্রভাব সম্পর্কে তথ্য তেমন জানা যায় না।
আবার, ব্যবসা-বাণিজ্য নয়, শুধুমাত্র ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যেই এসেছেন অনেকেই। তাদের ব্যাপারেও ইতিহাসে খুব বেশি তথ্য উঠে আসেনি। তবে কিছু সংখ্যক মুবাল্লিগের ব্যাপারে ইতিহাস নীরব থাকতে পারেনি। তাঁদের মধ্যে শাহ মুহাম্মদ সুলতান বালখী (রহ.), শাহ মুহাম্মদ সুলতান রুমী (রহ.), বাবা আদম শহীদ (রহ.), শাহ মাখদুম (রহ.), বায়েজিদ বোস্তামি (রহ.) প্রমূখ অন্যতম।
• শাহ মুহাম্মদ সুলতান বালখী (রহ.)
মধ্য এশিয়ার বালখের শাসক শাহ মুহাম্মদ সুলতান বালখী (রহ.) রাজ্য শাসন ত্যাগ করে দিমাস্ক (বর্তমান দামেস্ক) এসে বহু বছর তাওফীক নামক একজন নেক লোকের সান্নিধ্যে থাকেন। ওই ব্যক্তি তাকে বাংলাদেশে এসে ইসলাম প্রচারে উৎসাহিত করেন। তদুদ্দেশ্যে তিনি নৌ-পথে সন্দ্বীপ পৌঁছেন। অতপর নৌ-পথে তিনি আসেন হিন্দু রাজা বলরামের রাজ্য হরিরামনগর। সম্ভবত মানিকগঞ্জ জিলার হরিরামপুরই সেই কালের হরিরামনগর। রাজা বলরাম একজন মুসলিম মুবাল্লিগের উপস্থিতি বরদাশত করতে প্রস্তুত ছিলেন না। তিনি তার সৈন্যসামন্ত নিয়ে শাহ মুহাম্মদ সুলতান বালখী ও তার সংগীদের ওপর চড়াও হন। শাহ মুহাম্মদ সুলতান বালখীও আত্মরক্ষার চেষ্টা করেন। সংঘর্ষে রাজা নিহত হয়। রাজার মন্ত্রী ইসলাম গ্রহণ করেন। শাহ মুহাম্মদ সুলতান বালখী এই নও মুসলিম মন্ত্রীকেই সিংহাসনে অধিষ্ঠিত করেন।
এরপর তিনি রাজা পরশুরামের রাজ্য়ে (বগুড়ার মহাস্থান) আসেন। রাজার বোন শিলাদেবী তন্ত্রমন্ত্র প্রয়োগ করে শাহ মুহাম্মদ সুলতান বালখীকে তাড়াবার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। রাজা পরশুরাম সুলতান বালখী ও তার সংগীদের ওপর সশস্ত্র হামলা চালান। যুদ্ধে রাজা পরশুরাম নিহত হয়। পরে তার মন্ত্রীও যুদ্ধ চালিয়ে প্রাণ হারায়। শিলাদেবী কালী মন্দিরে আশ্রয় নেয়। পরে করতোয়া নদীতে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করে।
রাজকুমারী রত্নমনি বন্দী হন। মুসলিমদের কথা ও আচরণ তাকে মুগ্ধ করে। তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। নিহত রাজা পরশুরামের সেনাপতি সুরখাবও ইসলাম গ্রহণ করেন। শাহ মুহাম্মদ সুলতান বালখীর উদ্যোগে সুরখাব ও রত্নমনির বিয়ে সুসম্পন্ন হয়।[6]
মহাস্থানে শাহ মুহাম্মদ সুলতান বালখী মাসজিদ ও ইসলামী শিক্ষালয় স্থাপন করেন এবং নিকটবর্তী অঞ্চলে তিনি ইসলাম প্রচার করতে থাকেন।
• শাহ মুহাম্মদ সুলতান রুমী (রহ.)
খ্রিষ্টীয় একাদশ শতকের মধ্যভাগে বাংলাদেশের নেত্রকোনা অঞ্চলে এসেছিলেন একজন বিশিষ্ট মুবাল্লিগ। তার নাম শাহ মুহাম্মদ সুলতান রুমী। ১০৫৩ সনেও তিনি জীবিত ছিলেন বলে একটি ঐতিহাসিক সূত্র থেকে জানা যায়।
একদল সংগী নিয়ে তিনি মদনপুর নামক স্থানে পৌঁছেন। এটি ছিল তখন একজন কোচ রাজার শাসনাধীন। কোচ রাজা প্রথমে তার প্রতি বিদ্বেষভাব পোষণ করেন। পরে তার মনোভাব পরিবর্তিত হয়। কোচ রাজা শাহ মুহাম্মদ সুলতান রুমীকে মদনপুর গ্রামটি দান করেন। এখানে অবস্থান করে শাহ মুহাম্মদ সুলতান রুমী (রহ.) ইসলাম প্রচার করতে থাকেন।[7]
• বাবা আদম শহীদ (রহ.)
খ্রিষ্টীয় দ্বাদশ শতকের গোড়ার দিকে বিক্রমপুরে (যার একাংশ মুনশীগঞ্জ জিলায় শামিল) একদল সংগী নিয়ে আদম নামক একজন মুবাল্লিগ এসেছিলেন। এই স্থানটি তখন বল্লাল সেন নামক একজন রাজার শাসনাধীন ছিলো।
আদম সাথীদেরকে নিয়ে এক স্থানে তাঁবু স্থাপন করে খাওয়ার জন্য একটি গরু জবাই করেন। একটি কাক গরুর গোসতের একটি টুকরা নিয়ে উড়ে যায়। আরেকটি কাকের তাড়া খেয়ে কাকটি গরুর গোসতের টুকরাটি ফেলে দেয়। রাজা বল্লাল সেনের সৈন্যদের একটি ক্যাম্পে গোসতের টুকরাটি পড়ে। সৈন্যরা বিষয়টি রাজাকে জানায়। হিন্দুরাজা বল্লাল সেন রাগাম্বিত হন এবং মুবাল্লিগ গ্রুপটির ওপর হামলা করার জন্য একদল সৈন্য পাঠান। আদমের নেতৃত্বে মুবাল্লিগগণ আত্মরক্ষার্থে যুদ্ধে নামতে বাধ্য হন। চৌদ্দ দিন পর্যন্ত লড়াই চলে। পঞ্চাদশ দিবসে রাজা নিজে রণাংগনে আসেন।
রাজার প্রচণ্ড আক্রমণের মুখে মুসলিমগণ একে একে প্রাণ হারাতে থাকেন। অবশেষ আদমও শাহাদাত বরণ করেন। এটি ছিল ১১১৯ সনের ঘটনা। রামপাল গ্রামে এই যুদ্ধ সংঘটিত হয়।[8]
স্থানীয় লোকেরা শহীদ আদম এবং তার সাথীদের লাশ কবরস্থ করেন। এ থেকে প্রতীয়মান হয় যে স্থানীয় লোকদের মধ্যে কিছু সংখ্যক লোক আগে থেকেই মুসলিম ছিলেন। অমুসলিমদের তো মুসলিমদের মৃতদেহ দাফন করার পদ্ধতি জানা থাকার কথা নয়।
• শাহ মাখদুম (রহ.)
খ্রিষ্টীয় দ্বাদশ শতকের শেষ দিকে শাহ মাখদুম রূপোস নামে একজন মুবাল্লিগ আসেন রাজশাহী অঞ্চলে। খ্রিষ্টীয় ১১৮৪ সনেও তিনি সেখানে ছিলেন বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। ওই অঞ্চলে তিনিই ছিলেন ইসলামের প্রথম মুবাল্লিগ। রামপুর নামক গ্রামে তিনি অবস্থান গ্রহণ করেন। তার পবিত্র চরিত্র ও সুন্দর ব্যবহার লোকদেরকে আকৃষ্ট করে। তার সান্নিধ্যে এসে লোকেরা ইসলাম সম্পর্কে জ্ঞান হাছিল করতো। ইসলাম সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা লাভ করে বহু অমুসলিম ইসলাম গ্রহণ করেন। পরিবার থেকে বিতাড়িত হয়ে কিংবা তাঁর সান্নিধ্যে থাকার আকর্ষণে বহু নও মুসলিম রামপুর গ্রামে বসতি স্থাপন করেন। তাদের সংখ্যা এতো বেশি হয় যে রামপুর গ্রামে আর ঠাঁই মিলছিলো না। তাই পার্শ্ববর্তী গ্রাম বোয়ালিয়াতেও তারা বসবাস করতে শুরু করেন।
রামপুর ও বোয়ালিয়া বাস্তবে মুসলিম লোকায়লে পরিণত হয়। উল্লেখ্য যে, এই রামপুর-বোয়ালিয়াকে ভিত্তি করেই পরবর্তীকালে গড়ে উঠে রাজশাহী শহর। ঐতিহাসিকগণ পাল শাসনের (৭৫০-১১৬২) বিস্তীর্ণ অধ্যায়ের অল্প ক’জন ইসলাম প্রচারকের ত্যাগ ও সংগ্রামের কাহিনি এ যাবৎ সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছেন। বায়েজিদ বোস্তামী (চট্টগ্রাম, মৃত্যু ৮৭৪), শাহ নিয়ামতউল্লাহ (ঢাকা) এ অধ্যায়ের সবচেয়ে বিখ্যাত নাম।
ফরিদউদ্দিন আত্তার লিখেছেন, অষ্টম কি নবম শতাব্দীতে একদল ইসলাম প্রচারক সমুদ্রপথে আরবদেশ থেকে এসে চট্টগ্রামের সাগরতীরে নামেন এবং কিছুকাল তথায় অবস্থান করে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ইসলাম প্রচারে নিমগ্ন হন। চট্টগ্রাম রেল স্টেশনের পাশে পাহাড়ের আশেপাশে এরূপ কতিপয় নাম না জানা সেকালের ইসলাম প্রচারকের মাজার আছে। যদিও কবরের চিহ্ন আজ বিদ্যমান নেই, তবুও ঐতিহাসিক সত্য যে, হজরত শেখ আব্বাস বিন হামজা নিশাপুরী ঢাকাতেই ইসলাম প্রচার করতে করতে ৯০০ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন। সোজা কথায়, মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার তিনশত বছর পূর্বেই ঢাকায় ইসলাম প্রচারিত হয়েছে। দশম শতাব্দীতে ঢাকায় আরও যারা ইসলাম প্রচার করেন, তাদের মধ্যে শেখ আহমদ বিন মুহাম্মদ (খ্রিঃ ৯৫২), শেখ ইসমাইল বিন নাযাদ নিশাপুরী (খ্রিঃ ৭৯৫) প্রমুখ রয়েছেন।
‖ রাজনৈতিক বিজয়ের পূর্বে ইসলাম আগমনের ঐতিহাসিক/প্রত্নত্তাত্ত্বিক প্রমাণ
রংপুর থেকে ত্রিশ মাইল দূরে লালমনিরহাটের পঞ্চগ্রাম ইউনিয়নের (কুড়িগ্রাম জেলার) রামদাস মৌজার ‘মজদের আড়া’ গ্রামে ৬৮৯ খ্রিস্টাব্দের একটি মসজিদের ধ্বংসাবশেষ পাওয়া গেছে। ১৯৮৭ সালে পঞ্চগ্রামে ‘মজদের আড়া’ নামে পরিচিত জমিতে একটি বাঁশঝাড়ের উঁচু মাটির ঢিলা সমতল করতে গিয়ে এ মসজিদটি আবিষ্কৃত হয়। এটির অপর নাম সাহাবায়ে কেরাম জামে মসজিদ। সেখানে ১৭ হাত দীর্ঘ ও ১৫ হাত প্রস্থের একটি দালানের ছাদ মাটির নীচে দেখা যায়। এটি মসজিদের ছাদ বলে মনে হয়। এর একটি ইটে কালেমা তাইয়্যেবা ও ৬৯ হিজরি লেখা রয়েছে।
'মজদের আড়া’ স্থানটি থেকে দু’শ গজ দূরে প্রায় দশগজ উঁচু প্রাচীরবেষ্টিত প্রায় এক হাজার গজ দীর্ঘ ও এক হাজার গজ প্রস্থ বিশিষ্ট একটি গড় ছিল বলে জানা যায়। এই গড়টিকে এখন আবাদী জমিতে পরিণত করা হয়েছে। গ্রামের নাম ‘মজদের আড়া’ আসলে ‘মসজিদের আড়া’র অপভ্রংশ বলে মনে হয়। আড়া মানে ঘাঁটি, ডাঙ্গা বা কিনারা। এই মসজিদকে ঘাঁটি করে ইসলাম প্রচারের প্রথম যুগে হয়তো এখানে একটি মুসলিম জনপদ গড়ে উঠেছিল। সে থেকে এ অঞ্চলটি 'মসজিদের আড়া’ নামে পরিচিত হয়েছিল। এই স্থান থেকে সিকি মাইল দূরে ‘ফকিরের তকেয়া’ নামে একটি জায়গা এবং মস্তবীরহাট নামে একটি হাট রয়েছে। ‘মজদের আড়া’ গ্রামের চারিদিকে তিন-চার মাইলের মধ্যে অনেক প্রাচীন মাযারও রয়েছে। ঐতিহাসিক কিছু তথ্য থেকে ধারণা করা যায় যে মোহাম্মদ বিন কাসিমের সিন্ধু বিজয়ের চব্বিশ বছর আগে উমাইয়া শাসক প্রথম মারওয়ানের পুত্র আবদুল মালেকের শাসন আমলেই বাংলার এই নিভৃত এলাকায় মুসলিম জনপদ গড়ে উঠেছিল। এই ধরনের মুসলিম জনপদ এবং তাদের ধর্মীয় কার্যক্রমের কেন্দ্ররূপে বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে সে আমলে মসজিদ প্রতিষ্ঠার খবর বিস্ময়কর হলেও তার সম্ভাবনা অস্বীকার করা যায় না।
উপর্যুক্ত আলোচনা প্রমাণ করে যে, দেশে ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ বিন খিলজী নয় বরং ১২০৪ খ্রিস্টাব্দে তার বাংলা বিজয়ের প্রায় ৬০০ বছর আগেই সাহাবিদের দ্বারা বাংলাদেশে ইসলাম ধর্মের আবির্ভাব হয়। প্রথম মসজিদও নির্মিত হয় সেই সময়েই।
রাজশাহীর পাহাড়পুরে বৌদ্ধ বিহার খননকালে একটি আরবী মুদ্রা পাওয়া যায়। এই মুদ্রাটি তৈরী হয়েছে ৭৮৮ খৃষ্টাব্দে অর্থাৎ খলিফা হারুনুর রশীদের শাসনকালে।... কুমিল্লা জিলার ময়নামতিতে অনুরূপ খননকার্যকালে বনু আব্বাস যুগের দুইটি মুদ্রা পাওয়া যায়। [9] এইসব মুদ্রাপ্রাপ্তি এই কথাই প্রমাণ করে যে খ্রিষ্টীয় নবম শতকে বাংলাদেশে আরব মুসলিমদের যাতায়াত ছিল।
৭৫০ খৃস্টাব্দে বাংলাদেশে পালবংশের রাজত্ব শুরু হয়। পালগণ বৌদ্ধ ছিলেন। পাল বংশের সর্বশ্রেষ্ঠ রাজা ছিলেন ধর্মপাল। তিনি ৭৭০ খৃষ্টাব্দ থেকে ৮১০ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত রাজ্য শাসন করেন। ধর্মপাল পাঞ্জাবের উত্তরে হিমালয়ের পাদদেশ পর্যন্ত রাজ্য বিস্তার করে কান্যকুঞ্জে অভিষেক অনুষ্ঠান করেন। এই অনুষ্ঠানে ভোজ, মৎস্য, মদ্র, কুরু, যদু, যবন, অবন্তি, গান্ধার এবং কীর রাজ্যের রাজাগণ উপস্থিত ছিলেন।
ইতিহাসবিদ রমেশ চন্দ্র মজুমদার মন্তব্য করেন যে, যবন রাজ্যটি সম্ভবত সিন্ধু নদীর তীরবর্তী কোন মুসলিম অধিকৃত রাজ্য হবে। [10] তার উক্তি থেকে বুঝা যায় যে, খ্রিষ্টীয় অষ্টম শতকের শেষভাগ এবং নবম শতকের প্রথম ভাগে সিন্ধু নদীর তীরবর্তী আরব মুসলিম শাসিত এক বা একাধিক রাজ্যের সাথে পাল শাসিত বাংলাদেশের যোগাযোগ ছিল।
এ প্রসঙ্গে মিনহাজউদ্দিনের ‘তবকত-ই-নাসিরি’ হতে আমরা একটি ঘটনা তুলে ধরতে পারি। মিনহাজ বলেন, বখতিয়ার খলজি ১৮ জন সৈন্য নিয়ে যখন ছদ্মবেশে বাংলার রাজধানী নদিয়ায় প্রবেশ করেন তখন নগরীর অধিবাসীরা তাঁকে আরবীয় ঘোড়া ব্যবসায়ী মনে করেছিল তারা যে নগর দখল করতে এসেছে এমন সন্দেহ তাদের হয়নি। এর দ্বারা প্রমাণ হয় যে, ইসলাম-পূর্ব যুগেও বাংলার স্থানীয় অধিবাসীদের সাথে আরব বণিকদের ব্যবসায়িক সম্পর্ক ছিল। এ সম্পর্ক যদি না-ই থাকত তাহলে বখতিয়ারকে কখনোই স্থানীয় অধিবাসীরা ব্যবসায়ী হিসেবে মনে করত না।
এইসব তথ্য সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে আরব বণিক এবং মুবাল্লিগদের মাধ্যমেই বাংলাদেশে সর্বপ্রথম ইসলামের আলো পৌঁছে। পরবর্তীকালে অনারব অঞ্চল থেকেও মুসলিমগণ এই দেশে আসতে থাকেন।
মুসলিম বণিক এবং মুবাল্লিগদের উপস্থাপিত শিক্ষা ও আচরণ স্থানীয় লোকদের একাংশকে মুগ্ধ করে। তাঁরা ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব ও সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। এইভাবেই বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে মুসলিম লোকালয় গড়ে ওঠে। এভাবে ধীরে ধীরে মুসলিমদের সংখ্যা এই অঞ্চলে বৃদ্ধি পেতে থাকে যা মুসলমানদের সামরিক বিজয়ের পথ প্রশস্ত করে।
‖ খোলাফায়ে রাশেদাগণ কর্তৃক বিশেষ অভিযান প্রেরণ
হযরত উমর (রা.) কর্তৃক পারস্য বিজয়ের পর উপমহাদেশীয় অঞ্চলসমূহকে খিলাফতভুক্ত করার প্রতি মুসলমানদের দৃষ্টি প্রসারিত হয়। হযরত উমর (রা.) কর্তৃক নিযুক্ত বাহরাইন ও ওমানের শাসনকর্তা প্রখ্যাত সাহাবী হযরত উসমান বিন আবদুল আস-সাকাফী (রা.) ভ্রাতা আল-হাকামকে সিন্ধুর বরুচ অঞ্চলে এবং অপর ভ্রাতা মুগীরা বিন আবুল আসকে দেবল অভিযানে প্রেরণ করলে তাঁরা তথাস্থ ক্ষমতাসীনকে পরাজিত করে ভারতের সীমানায় প্রথম ইসলামের বিজয় কেতন উড্ডীন করেন। এসময়ে আগত সাহাবীদের মাঝে যাদের নাম জানা যায় তাঁরা হলেন- আবদুল্লাহ বিন আবদুল্লাহ ওতবান (রা.), আশ-ইয়াম বিন আমর তামীমী (রা.), সোহার বিন আল আবদী (রা.), সুহাইল বিন আদি (রা.) প্রমূখ।
হযরত উসমান (রা.) এর শাসনামলেও ভারতবর্ষে সিন্ধুনদসহ সিন্ধু অঞ্চলের বহু এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে ইসলামের ছায়াতলে আনতে সক্ষম হন।
হযরত আলী (রা.) এর খিলাফতকালে সিন্ধুর উত্তর পশ্চিমাঞ্চল মুসলিম সাম্রাজ্যভুক্ত হয়েছিলো।
‖ খোলাফায়ে রাশেদার যুগ পরবর্তী সাহাবীগণ কর্তৃক বিশেষ অভিযান প্রেরণ
হযরত মুআবিয়া (রা.) এর যুগে প্রথমে আবদুল্লাহ বিন সাওয়ার আবদীর নেতৃত্বে অতঃপর সিনান বিন সালমাহ হুযাইলীর নেতৃত্বে ভারত সীমান্তে আক্রমণ চালানো হয়। ৪৪ হিজরীতে প্রখ্যাত তাবেয়ী মুহাম্মদ বিন আবু সুফরাহ ১২ হাজার সৈন্য নিয়ে পাঞ্জাবের লাহোর ও বান্না এলাকা পর্যন্ত অগ্রসর হয়েছিলেন। কিন্তু মুআবিয়া (রা.) এর পরবর্তীকালে মুসলমানদের ঘরোয়া সমস্যার কারণে তারা ভারতবর্ষের প্রতি মনযোগ দিতে পারেননি।
পরবর্তী পর্বে আমরা রাজনৈতিক বিজয়ের মাধ্যমে উপমহাদেশে ইসলামের আগমন ও প্রসার নিয়ে আলোচনা করবো ইনশাআল্লাহ।
রেফারেন্স সমূহ :
[1] মাওলানা মুহাম্মদ আবদুর রহীম, হাদীস সংলনের ইতিহাস, পৃ.-৪৫৭
[2] মাওলানা নূর মোহাম্মদ আজমী, হাদিসের তত্ত্ব ও ইতিহাস, ঢাকা : এমদাদীয়া লাইব্রেরী, ১৯৯২, ৪র্থ সংস্করণ, পৃ.-১৩৫
[3] ডক্টর মোহাম্মদ এছহাক, ইলমে হাদিসের ভারতীয় উপমহাদেশের অবদান, অনুবাদ-হাফেজ মাওলানা মুহাম্মদ জাকারিয়া, ঢাকা : ই.ফা.বা. ১৯৯৩, ১ম সংস্করণ, পৃ.-৮
[4] বাংলাদেশে ইসলামঃ কয়েকটি তথ্যসূত্র, মুহীউদ্দীন খান, মাসিক মদীনা, জানুয়ারী ১৯৯২, পৃষ্ঠা-৪১
[5] বাংলাদেশে ইসলামঃ কয়েকটি তথ্যসূত্র, মুহীউদ্দীন খান, মাসিক মদীনা, জানুয়ারী ১৯৯২, পৃষ্ঠা-৪০
[6] এ হিষ্ট্রি অব সুফীজম ইন বেঙল, ড. এনামূল হক, পৃষ্ঠা- ২০৮
[7] বাংলাদেশে ইসলাম, আবদুল মান্নান তালিব, পৃষ্ঠা-৬৯
[8] এ হিষ্ট্রি অব সুফীজম ইন বেঙ্গল, ড. এনামুল হক, পৃষ্ঠা-২১১
[9] হিষ্ট্রি অব দ্যা মুসলিমস অব বেঙ্গল, ড. মুহাম্মদ মোহর আলী, পৃষ্ঠা-৩৮
[10] বাংলাদেশের ইতিহাস : প্রাচীন যুগ, রমেশ চন্দ্র মজুমদার, পৃষ্ঠা-৪৩, ৪৪
ছাত্রশিবির সিলেট মহানগরীর উদ্যোগে নগরীর গোটাটিকর এলাকায় অমুসলিম মেধাবী ছাত্রদের মাঝে শীতবস্ত্র বিতরণ করা হয়। আয়োজনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় কার্যকরী পরিষদ সদস্য ও সিলেট মহানগর সভাপতি জনাব শরীফ মাহমুদ।
#Shibir#Sylhet
রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন-
প্রত্যেক মানুষই ভুল-ত্রুটিকারী, আর ভুল-ত্রুটিকারীদের মধ্যে যারা তাওবাহ করে তারাই উত্তম।
তিরমিজি-২৪৯৯
ইবনু মাজাহ-৪২৫১
আহমাদ-১২৬৭
⇲⇲ উপমহাদেশে ইসলামের আগমন ও প্রসার ⇱⇱
বাংলায় ইসলামের আগমন ভারতীয় উপমহাদেশে ইসলামের আগমনের ইতিহাসের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বাংলাসহ সমগ্র উপমহাদেশে ইসলামের আগমন হয়েছিল নানাবিধ প্রক্রিয়ায়। এক্ষেত্রে প্রধানত চারটি প্রক্রিয়ার কথা উল্লেখ করা যেতে পারে-
১. আরব ব্যবসায়ীদের দ্বারা ইসলাম প্রচার
২. সুফী মাশায়েখগণ, দাঈগণ কর্তৃক দাওয়াতি কাজ
৩. খোলাফায়ে রাশেদাগণ কর্তৃক বিশেষ অভিযান
৪. রাজনৈতিক বিজয়
১. আরব ব্যবসায়ীদের দ্বারা ইসলাম প্রচার:
প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকেই আরব বণিকগণ বাণিজ্যের জন্য লোহিত সাগর, আরব সাগর এবং ভারত মহাসাগরের তীরবর্তী বন্দরগুলোতে আসা-যাওয়া করতেন।
ঐতিহাসিক খালিক আহমদ নিজামীর ‘আরব অ্যাকাউন্টস অব ইন্ডিয়া’ গ্রন্থে দক্ষিণ ভারতের মালাবার, কালিকট, চেরর এবং বাংলার চট্টগ্রাম ও আরাকান উপকূলে আরব জনগণের বসতি সম্পর্কে বিস্তৃত আলোচনা করা হয়েছে।
এলফিনস্টোন ‘হিস্টরি অব ইন্ডিয়া’ গ্রন্থে উল্লেখ করেন, বাণিজ্যিক যোগাযোগের ভিত্তিতে প্রাচীনকালেই ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন উপকূলে বহু আরব উপনিবেশ গড়ে উঠেছিল। একইভাবে আরবদের বিভিন্ন স্থানে গড়ে উঠেছিল ভারতীয় বসতি।
আরব দেশের বণিকেরা বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরগুলোতে এসে চন্দন কাঠ, হাতির দাঁত, মসলা এবং সুতি কাপড় ক্রয় করতেন এবং জাহাজ বোঝাই করে নিজেদের দেশে নিয়ে যেতেন।
ভারতের বিশিষ্ট ইসলামী গবেষক সাইয়েদ সুলাইমান নদভী তাঁর লিখিত গ্রন্থ ‘আরবোঁ কি জাহাজরানী’-তে লিখেন, “মিসর থেকে সুদূর চীন পর্যন্ত প্রলম্বিত দীর্ঘ নৌ-পথে আরবগণ যাতায়াত করতেন। মালাবার উপকূল হয়ে তাঁরা চীনের পথে বঙ্গোপসাগরে প্রবেশ করতেন।”
[বাংলাদেশে ইসলাম: কয়েকটি তথ্যসূত্র, মুহীউদ্দীন খান, মাসিক মদীনা, জানুয়ারী ১৯৯২, পৃষ্ঠা-৪১]
কেরালা ও লাক্ষাদ্বীপে বসবাসকারী মাপিলার জাতি-গোষ্ঠিই সম্ভবত উপমহাদেশের প্রথম ইসলাম গ্রহণকারী সম্প্রদায়। ৬২৯ খ্রিষ্টাব্দে স্থানীয় রাজা চেরামান পেরুমলের পৃষ্ঠপোষকতায় মালিক বিন দিনার রা. চেরামান জুমা মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেন। তখন থেকেই দায়ীদের দাওয়াতের মাধ্যমে অসংখ্য স্থানীয় মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেন। এমনকি ভারত থেকে কিছু সংখ্যক লোক মদীনায় গিয়ে রাসূল সা.-এর সংস্পর্শ লাভেও ধন্য হন। যাদের নাম জানা যায় তাঁদের মধ্যে, বাবা রতন আল-হিন্দ অথবা রতন আবদুল্লাহ আল-হিন্দ মদিনায় গিয়ে রাসূল সা.-এর কাছে ইসলাম গ্রহণ করে সাহাবী হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেছিলেন। আরব মুসলমান ও ভারতীয়দের মধ্যে বাণিজ্যের প্রেক্ষিতে ভারতীয় সমুদ্র তীরবর্তী জনবসতিসমূহে ইসলামের প্রসার ঘটতে থাকে।
আরব মুসলমান বণিকদের আগমন এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের ইসলাম গ্রহণের মধ্য দিয়েই ধীরে ধীরে মুসলমানদের সংখ্যা বাড়তে থাকে।
বাংলাদেশের বিশিষ্ট ইসলামী গবেষক মাওলানা আকরাম খাঁ তাঁর রচিত ‘মোছলেম বঙ্গের সামাজিক ইতিহাস’ গ্রন্থে লিখেন, “আরব বণিকগণ এই পথ ধরেই বাংলাদেশ ও কামরূপ (আসাম) হয়ে চীনে যাতায়াত করতেন। মালাবার ছিল মধ্য পথের প্রধান বন্দর। বঙ্গোপসাগরে প্রবেশের পূর্বে তাঁরা মাদ্রাজ উপকূলেও নোঙর করতেন বলে জানা যায়। দীর্ঘপথে পালে-টানা জাহাজের একটানা সফর সম্ভবপর ছিল না। পথে যেসব মনযিল ছিল সেগুলোতে আবশ্যিকভাবে জাহাজ মেরামত করা হতো এবং পরবর্তী মনযিলের জন্য রসদ সংগ্রহ করতে হতো।”
[তথ্যসূত্র : বাংলাদেশে ইসলাম - মুহীউদ্দীন খান, মাসিক মদীনা, জানুয়ারী ১৯৯২, পৃষ্ঠা-৪১]
✓ আরব ব্যবসায়ীদের দ্বারা ইসলাম প্রচারের ব্যাপারে আরব ঐতিহাসিকদের বিবরণ:
আরব ভূগোলবিদ আবুল কাসিম উবাইদুল্লাহ ইবনু খরদাধবিহ বলেন, “সরন্দ্বীপ (শ্রীলঙ্কা) এবং গোদাবরী নদ পেরিয়ে এগিয়ে গেলে সমন্দর নামে একটি বন্দর রয়েছে যার আশেপাশে প্রচুর ধান উৎপন্ন হয়। তিনি আরো জানান, এই বন্দরে কামরূপ (আসাম) থেকে মিষ্টি পানির পথে পনেরো-বিশ দিনে নৌকাযোগে চন্দন কাঠ আনা হয়।”
আরব ভূগোলবিদ আবু আবদিল্লাহ আল ইদরিসীও এই বন্দরের কথা উল্লেখ করে বলেছেন, “এটি একটি বড়ো বন্দর এবং কামরূপ থেকে নদীপথে কাঠ এনে এখানে বিক্রয় করা হয়। তিনি আরো জানান যে এই বন্দরটি একটি বড়ো নদীর মোহনায় অবস্থিত।”
[হিষ্ট্রি অব দ্যা মুসলিমস অব বেঙ্গল, ড. মুহাম্মদ মোহর আলী, পৃষ্ঠা-৩০]
এসব বর্ণনা ইঙ্গিত বহন করে মেঘনা নদীর তীরের চাঁদপুরই ছিল সে নদীবন্দর যেখানে আরব বণিকগণ প্রধানত চন্দন কাঠের জন্য আসতেন।
আবু আবদিল্লাহ আল ইদরিসী লিখেছেন, “বাগদাদ ও বসরা থেকে আরব বণিক এবং পর্যটকগণ মেঘনার মোহনার সন্নিকটস্থ অঞ্চলে আসা-যাওয়া করতেন।”
আরব ভূগোলবিদ আবুল কাসিম উবাইদুল্লাহ ইবন খুরদাধবিহ লিখেন, “সরন্দ্বীপের পর জাতিরাতুর-রামি নামক একটি ভূখণ্ড আছে।”
আরব ভূগোলবিদ আল মাসউদী উল্লেখ করেন, “ভারত সাগরের তীরে নদী বিধৌত একটি দেশ রয়েছে।”
আরব ভূগোলবিদ ইয়াকুত ইবনু আবদিল্লাহ বলেন, “এই ভূ-খণ্ডটি মালাক্কার দিকে ভারতের দূরতম অঞ্চল।”
একসময় চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের একটি বিস্তৃত অঞ্চলজুড়ে রামি বা রামু নামে একটি রাজ্য ছিল। সুলাইমান নামক একজন আরব বণিক বলেন, “রামির রাজার পঞ্চাশ হাজার হাতি এবং পনেরো হাজার সৈন্য ছিল।”
[হিষ্ট্রি অব দ্যা মুসলিমস অব বেঙ্গল, ড. মুহাম্মদ মোহর আলী, পৃষ্ঠা-৩৫]
এসব তথ্য ইঙ্গিত বহন করে আরব ভূগোলবিদগণ জাজিরাতুর রামি নামে যে ভূ-খন্ডের কথাউল্লেখ করেছেন তা পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলই ছিল। কক্সবাজারের সমুদ্র সন্নিকটবর্তী আজকের রামু সেই রাজ্যেরই একটি ক্ষুদ্রাংশ। আরব ভূগোলবিদগণের বর্ণনা থেকে প্রমাণিত হয় আরব বণিকগণ তাঁদের বাণিজ্য জাহাজ নিয়ে চট্টগ্রাম আসতেন এবং মসলা, হাতির দাঁত ইত্যাদি সামগ্রী সংগ্রহ করতেন।
ইতিহাসবিদদের বর্ণনা থেকে উপমহাদেশে আরব ব্যবসায়ীদের দ্বারা ইসলাম প্রচার ও প্রসারের ব্যাপারে উপরিউক্ত ঘটনাবলির বিবরণ সংক্ষেপে তুলে ধরা হয়েছে।
পরবর্তী পর্বে আমরা উপমহাদেশে ইসলামের আগমন ও প্রসারের নিম্নোক্ত প্রক্রিয়াগুলো নিয়ে আলোচনা করব ইনশাআল্লাহ-
* সুফী মাশায়েখগণ/দাঈগণ কর্তৃক দাওয়াতি কাজ
* খোলাফায়ে রাশেদাগণ কর্তৃক বিশেষ অভিযান
* রাজনৈতিক বিজয়
উমার ইবনে খাত্তাব (রাঃ) থেকে বর্ণিত-
রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন,‘মহান আল্লাহ কুরআন মাজীদের বরকতে তার ওপর আমলকারী জনগোষ্ঠীর উত্থান ঘটান এবং কুরআনের অবাধ্যতার কারণেই একটি গোষ্ঠীর পতন সাধন করেন।
সহিহ মুসলিম-১৯৩৪