অনেকেরই বই পড়া শুরু নিছক আনন্দ বা অবসর কাটানোর ইচ্ছা থেকে। কারো আবার ইলমের প্রতি আগ্রহ থেকে। কারো কারো অন্যের হাতে দারুণ কোন বই দেখে। অনেকেরই মনে হয়, কোন এক আপন 'বন্ধু' বইরুপে আমাকে আল্লাহ রসূলের (স) কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। তখনই ভালোবাসা জাগে সেই বইয়ের প্রতি। সেই বন্ধুর প্রতি।
ইতিহাসের কিছু বই বাসায় কেনা। পড়বো পড়বো করে আর ধরা হচ্ছে না। একটা মার্শাল জি এস হডসনের 'রিথিংকিং ওয়ার্ল্ড হিস্ট্রি'। মোটাসোটা বই। ইলহাম প্রকাশনীর। আরেকটা ইয়াসির কাদ্বির লেকচার থেকে 'মুসলিম ইতিহাসে উত্থান পতন'। এটাও ইলহামের। ৩য় বইটাও ইলহামেরই- 'সাহাবিদের জ্ঞানচর্চার ইতিহাস'।
হুমায়ূন পরবর্তীকালে দুজন গদ্য লেখকের প্রতিই আকর্ষণ জেগেছে। ইশতিয়াক আহমেদ, শরীফুল হাসান। ইশতিয়াক ভাইয়ের বইগুলো ২০১৮-১৯ এর পর নিয়মিত না পড়লেও খোঁজখবর রাখা হয়েছে ঠিক। এদিকে শরীফুল হাসানের একটা বই পড়েই মনে হয়েছে, এটাই হয়তো এই জীবনে পড়া সেরা উপন্যাস- 'বাতাসে বৃষ্টির ঘ্রাণ'।
ইদানিং ইতিহাসের কিতাবে আগের মতো আগ্রহ বোধ করিনা। নিজের সবচেয়ে প্রিয় বিষয়টায় হঠাৎ কেনো অনীহা জাগলো কে জানে। একটা কারণ হতে পারে, গত বছর ইতিহাসের বই বেশি পড়ার কারণে একঘেয়েমি চলে আসা। অন্য কোন কারণ আর মাথায় আসে না। এই বছর ইতিহাস পড়লেও এমন কিছু পড়তে হবে যা আগে কখনো ধরা হয়নি।
ইসলামি প্রকাশনায় দুটি নাম সবসময় স্মরণ রাখতে হবে। এক- সিয়ান পাবলিকেশন, দুই- আরিফ আজাদ৷ সিয়ানকে মনে রাখতে হবে, প্রচ্ছদ থেকে শুরু করে বইয়ের পাতার মান আর সাজসজ্জার ব্যাপক উন্নতির জন্য। আরিফ আজাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা, সঠিক সময়ে পাঠকের অবস্থা বুঝে সঠিক বই ও লেখাগুলো নিয়ে আসার জন্যে।
কিছু বইতে ভারিক্কী কথাবার্তা থাকে না। থাকে দ্বীনের সহজ সরল আলোচনাই। নামাজ, রোজা, ঈমান, আমল, এসব কিছুই। তবে কথাগুলো লেখকের হৃদয় থেকে উৎসারিত হওয়ায় বইটাও পাঠকের হৃদয়ে যেয়ে স্থান নেয়। শাইখ মূসা আবদুল্লাহর 'হার্দিক প্রশান্তির খোঁজে' তেমনই এক বই। মূল বই, প্রচ্ছদ। দুটোতেই সুকুন।
এই জীবনে পড়া সবচেয়ে প্রিয় বই কোনটা? বইতো আসলে অনেক৷ ছোটকালের তাজ্জব লাগা বই। কৈশোরে উচ্ছাস জাগানো বই। তারুণ্যে উদ্দীপনা তোলা বই। এই সময়ে এসে দ্বীনের প্রতি ভালোবাসা বাড়ানো বই। তবে সবকিছু ছাপিয়ে, সবাইকে হারিয়ে, আমার সবচেয়ে প্রিয় বই- শরীফ মুহাম্মদ ভাইয়ের 'রঙিন মখমল দিন'।
একসময় বিশ্বকোষ বইগুলো একদম ভালো লাগতো না। কিনতেও না, পড়তেও না। মোটামোটা বইগুলো দেখলে মনে হতো এসব কিনে শুধুই বুকশেলফের সৌন্দর্য বাড়ানো; পড়ার বেলায় ঠনঠন। তবে মুসলিম উম্মাহর ইতিহাস পড়ে এখন বিশ্বকোষকেই ভালোবাসি অনেক। মনে হয়, নানান পড়া বাদ দিয়ে বিশ্বকোষগুলোই পড়ি একের পর এক।
মাঝে মাঝে খুব আবেগ আপ্লুত হই। শুরু করি সাহিত্যের ঢঙে লেখা জীবনী পড়া । যদিও জানি, এসব বই আমার পক্ষে সামলানো মুশকিল। তারপরও একটু 'হালকা কিসিমের' বই পড়ার তাড়না থেকে বইগুলো হাতে নিই। তবে ফলাফল শূন্য। কিছু পাতা পড়ার পর মনে হয়, আল্লাহ বাঁচাও। জীবনীর বই শুকনো খটমট হলেই আসলে সেরা।
দেশের ইসলামিক বই অনুবাদে অকল্পনীয় উন্নতি হয়েছে। আরবী বা উর্দুর কিছু অনুবাদ হয়তো মূল বইকেও টেক্কা দিয়ে দিয়েছে। ওদিকে সেক্যুলার ঘরানার অনুবাদ বইগুলোর অবস্থা যেনো আগের মতোই 'কেরোসিন'। ১০০টার মধ্যে ৮০টা অনুবাদ হাতে নিলেই মনে হবে, অনুবাদের পর অনুবাদক নিজেই বইটা আর পড়ে দেখেননি।
প্রখ্যাত কোন লেখক মারা গেলে এক বিশেষ শ্রেণীর উদ্ভব হয়। যারা বলে, আমি অমুকের কোন বই-ই পড়িনি। তমুকের বই আসলে 'ওভাররেটেড'। কারো লেখা ভালো না লাগা আসলে সমস্যা না। সমস্যা হলো, আমার ভালো না লাগা লেখককে যদি অন্য কারো ভালো লাগে তাহলে সেই পাঠককে হেয় মনে করা। তার রুচিকে প্রশ্নবিদ্ধ করা।
যখন কেন্দ্রীয় খেলাফতের বাইরেও বিভিন্ন স্বাধীন হুকুমত তৈরি হলো, পরিবারের মধ্যেই ক্ষমতার লড়াই শুরু হলো, কয়েক বছরে বহু খলিফাই ক্ষমতায় বসলেন, এই ইতিহাসগুলোর ধারাবাহিকতা মাথায় রাখা খুবই কঠিন। ইতিহাসের বই পড়তে যেয়ে কোন জায়গায় যে কার হুকুমত চলছে তা মনে রাখাটা বিশাল এক কর্মযজ্ঞ।
একটা ছোট নিয়ম মেনে বই কিনলে অধিকাংশ সময় ভালো বই-ই স্বয়ংক্রিয়ভাবে হাতে চলে আসে। এমন বই কিনুন যার লেখক ইতোমধ্যে দুনিয়া ছেড়ে চলে গেছেন। অথবা সেই বই কিনুন যা লেখা হয়েছে এমন কারো জীবন নিয়ে যিনি আর দুনিয়াতে নেই। দেখবেন, অনেক কষ্ট কসরত ছাড়াই আপনি দারুন কিছু বই জমা করে ফেলেছেন।